বিআরটিএর টাইগার আইটির ম্যানেজারদের কোটিপতি হওয়ার কারিগর শিতাংশু
নিজস্ব প্রতিবেদক
২-৯-২০২৫ দুপুর ৩:৫৯
বিআরটিএর টাইগার আইটির ম্যানেজারদের কোটিপতি হওয়ার কারিগর শিতাংশু
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) বহুল আলোচিত পরিচালক (রোড সেফটি) শিতাংশু শেখর বিশ্বাসের ভায়রা বিপ্লব কুমার বিশ্বাস ও রাজধানীর উত্তরা (বিআরটিএ) টাইগার আইটি ম্যানেজার ফরহাদ হোসেন ; ডমিনিক ফালিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব দুর্নীতি অনিয়মের বিষয়ে তদন্তপূর্বক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ অটোরিকসা, অটোটেম্পু শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মো. জামাল আকন দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ করেছেন।
জানা গেছে, আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট (আইটি আই আই ইউ) জালিয়াতি চক্রের নায়ক শিতাংশু শেখর বিশ্বাসের ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ হওয়ার তথ্য ফাঁসের পর তার সহযোগিদের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছেন। ‘দৈনিক সকালের সময় গত ২৯ আগস্ট স্বৈরাচার সরকারের দোসর শিতাংশু -আলামিন সিন্ডিকেটের কাছে সেবা প্রত্যাশিরা জিম্মি’ শিরোনামে এক প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পর মিরপুর বিআরটিএর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। শিতাংশু ও আল আমিনের নানা অনিয়ম দুর্নীতির তথ্য এবং তাদের কাছে সেবা প্রত্যাশিদের হয়রানীর কথা জানিয়েছেন।
সূত্র জানায়, কালো তালিকাভুক্ত টাইগার আইটি সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাসিনার নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকীর ছত্র-ছায়ায় বিআরটিএর প্রকল্পে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর অফিসের (পিএমও) দাপটে কোনো বিআরটিএ অফিসার দীর্ঘ দিন মুখ খোলেননি। এই সিন্ডিকেটের নায়ক বিপ্লব কুমার বিশ্বাস ও ফরহাদ হোসেন ও ডমিনিক ফালিয়া চক্রের জাল জালিয়াতি অবৈধ ও ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স ঠেকাতে ২০১১ সালে ইলেকট্রনিক চিপযুক্ত ডিজিটাল স্মার্টকার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রবর্তন করা হয়। আধুনিক প্রযুক্তির এই টাইগার আইটি-ই শুরু থেকেই বিআরটিএ প্রকল্পে যুক্ত ছিল। বিশ্বব্যাংকের কালো তালিকাভুক্ত হওয়া গত ২০১৯ সালের আগস্টে ‘টাইগার আইটি’র সঙ্গে বিআরটিএর চুক্তি বাতিল করে। এটা এক ধরনের আইওয়াশ ছিল মাত্র। এরপর নতুন টেন্ডার করে মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্সকে নিয়োগ দিলেও চুক্তির মেয়াদ গত ২০২১-এর জুন পর্যন্ত স্মার্টকার্ডের সার্ভার এবং ডেটাবেজ হস্তান্তর করতে গড়িমসি করতে থাকে। গত ২০২০ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি টেন্ডার ছাড়াই ৪ লাখ ডিজিটাল স্মার্টকার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্স কিনতে ১৮ দশমিক ৯ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হাসিনার মন্ত্রিসভা। আর প্রতিটি লাইসেন্স প্রায় ১০ গুণ বেশি দামে উচ্চাপর্যায়ের নির্দেশে তা কেনা হয়। এর জন্য প্রতিটি স্মার্টকার্ডের বাজারমূল্য ৫০ টাকা হলেও প্রকল্পে প্রায় ৫০০ টাকা (৪৭২.৬০ টাকা) করে কেনা হয়। আগের বছরগুলো ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যুর পরিসংখ্যান ও সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ চাহিদা বিবেচনা করে প্রতি বছর গড়ে ৩ লাখ স্মার্টকার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রয়োজন হয়। এর পুরোটাই টাইগার আইটি সরবরাহ করে আসছে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে। তৎকালীন টাইগার আইটির চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমান এখন বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন বলে জানা গেছে।
এদিকে রাজধানীর মিরপুর-১৩ বিআরটিএ কর্মরত টাইগার আইটির ম্যানেজার আল-আমিন এর আধিপত্য নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকেই তার সিন্ডিকেটের সদস্যরা তৎপরতা শুরু করেছে। স্বৈরাচারী ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় গড়ে তোলা দালাল চক্রের গডফাদার হিসেবে তিনি এখনো আধিপত্য বিস্তার করে আসছেন। তার নেতৃত্বে প্রায় শতাধিক দালাল দালালীর কাছে ব্যস্ত থাকছেন। তাদের দিয়ে প্রতিদিন নানা জালিয়াতিসহ সেবা প্রত্যাশীদের হয়রানী ছাড়াও ‘মব’ সৃষ্টি করা হচ্ছে। মিরপুরে বিআরটিএ-১৩ এর কার্যালয়ে মাঝে মধ্যে যৌথ বাহিনী অভিযান চালিয়ে দালালদের আটক করছে। মোবাইল কোর্ট বসিয়েও জেল জরিমানা করা হচ্ছে। তারপরও টাইগার আইটির আল আমীন বাহিনীর তাণ্ডব থামছে না। দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের ম্যানেজার বিপ্লব কুমার বিশ্বাস ইকুরিয়ায় এক বাহিনী গড়ে তুলেছেন। সেখানে তিনি দীর্ঘ ৮ বছর ধরে আছেন। অতিদ্রুতম সময়ের মধ্যে তাকে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া না হলে যে কোন সময় সেবা প্রত্যাশীরা প্রতিরোধ করবেন বলেও ভুক্তভোগিরা জানিয়েছেন।
জানা গেছে, রাজধানীর উত্তরা বিআরটিএর টাইগার আইটির ম্যানেজার ফরহাদ হোসেন ও মিরপুরের টাইগার আইটির ম্যানেজার আল-আমিন চাকরির প্রথম জীবনে দুই একটি বাসার সাবলেট হিসাবে মেসে ভাড়া থাকতেন। এখন তারা দুজনের বিআরটিএর জাল জালিয়াতির মাধ্যমে কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। এই স্বল্প বেতনে চাকরি করে এত টাকার মালিক কিভাবে হলেন, তা নিয়ে তাদের পরিচিতজন ও প্রতিবেশীদের মধ্যে আলোচনা সমালোচনার ঝড় বইছে। মিরপুর-১৩ এর বিএরটিএর টাইগার আইটির ম্যানেজার আল-আমিন তার স্ত্রীকে নিয়ে মাঝে মধ্যেই বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। সাবেক সরকারের পতনের পর তিনি স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য জার্মানিতে পাড়ি জমাবেন বলে তার পরিচিতজনের বলা বলি করছেন। অনেক ভুক্তভোগীরা বলছেন, ফরহাদ ও বিআরটিএর পরিচালক শীতাংশু শেখর বিশ্বাসের ভায়রা; দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ বিআরটিএর টাইগার আইটি’র ম্যানেজার বিপ্লব কুমার বিশ্বাস দীর্ঘ ৮ বছর ধরে একই জায়গায় রয়েছেন। তিনি শিতাংশু শেখর বিশ্বাসের পরিচয়ে একক আধিপত্য বিস্তার করে কয়েক কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। ব্যাংক হিসাবসহ সম্পদের খোঁজ নিলে আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হওয়ার প্রমাণ মিলবে বলে ভুক্তভোগিরা জানিয়ছেন। আর জালিয়াতির সিণ্ডিকেটের অন্যতম সদস্য বিপ্লব কুমার বিশ্বাস ও ফরহাদ নিজেদের এবং তাদের আত্মীয়-স্বজনের নামে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন।
সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পর এক যুগের বেশি সময় ধরে বিআরটিএতে বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ পেয়ে আসছে একটি দুর্নীতি গ্রস্ত কালো তালিকার প্রতিষ্ঠান টাইগার আইটি। সক্ষমতা থাকলেও বিআরটিএর আরএফআইডি স্মার্টকার্ড প্রকল্পে টাইগার আইটির সঙ্গে দেশীয় কোন প্রতিষ্ঠান যায়নি। তখন শিতাংশু শেখর বিশ্বাস তারেক সিদ্দিকী ও সজিব ওয়াজেদ জয় এর প্রভাব খাটিয়েছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে কোনো প্রকার প্রতিযোগিতা ব্যতিত কাজ পেতো টাইগার আইটি।
টাইগার আইটির চেয়ারম্যানের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা থাকায় ওরাকল, সিসকোর মতো মার্কিন প্রতিষ্ঠান টাইগার আইটির সঙ্গে কাজ করা বন্ধ করে দেয়। নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে কাজ করতে ইউরোপের কয়েকটি শেলকোম্পানিসহ কয়েকটি কোম্পানীর সঙ্গে চুক্তি করে, প্রকৃতপক্ষে মুদ্রা পাচারের জন্য চুক্তিগুলো করা হয়েছিল। এছাড়া নির্বাচন কমিশন, ঢাকা ওয়াসা, পাসপোর্ট অধিদপ্তর, এনআইডি অনুবিভাগের বিভিন্ন প্রকল্প থেকে বাংলাদেশে আইবিসিএস-প্রাইমেক্স নামে ছদ্মবেশী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কয়েক শ কোটি টাকার কাজ করেছে টাইগার আইটি। নির্বাচন কমিশনের স্মার্টকার্ড মুদ্রণ-সংক্রান্ত বিশ্বব্যাংকের প্রকল্পেও দুর্নীতি প্রমাণিত হয়েছে টাইগার আইটির বিরুদ্ধে। দুর্নীতির অভিযোগে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান টাইগার আইটিকে ২০১৯ সালে সাড়ে ৯ বছরের জন্য এবং প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমানকে সাড়ে ৬ বছরের জন্য কালো তালিকাভুক্ত করে। তারপরও বিআরটিএতে টাইগার আইটির আধিপত্য বিস্তার করে। বিআরটিএর স্মার্টকার্ডসহ সরকারি প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেন পলাতক তারিক আহমেদ সিদ্দিকের স্ত্রী শাহনাজ সিদ্দিক। তিনি ভারতীয় একটি চক্রের মাধ্যমে এখনো চেষ্টা করছেন। বিভিন্ন কোম্পানির নামে পুরো প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ টাইগার আইটি করছেন। অথচ কালো তালিকাভুক্ত হিসেবে ২০২৭ সাল পর্যন্ত বিশ্বব্যাংকের কোনো টেন্ডারে অংশ নিতে পারবে না টাইগার আইটি।
পলাতক শেখ হাসিনার নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক ও সাবেক সড়ক পরিবহন এবং সেতুমন্ত্রী ওয়াবদুল কাদেরের প্রভাব খাটিয়ে বিআরটিএর এ প্রকল্পের কাজ করতে কোনো টেন্ডার ও যাচাই-বাছাই করতে হয়নি। এতে সরকারি কাজে বিআরটিএর প্রকল্পকে কুক্ষিগত করে বছরের পর বছর কাজ পেয়ে আসছে টাইগার আইটি। আর এই টাইগার আইটির ম্যানেজার আল আমিন একক আধিপত্য বিস্তার করে আসছেন।
উল্লেখ্য, গত ২০০৮ সালে তৎকালীন যোগাযোগ মন্ত্রণালয় বিআরটিএ এর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত করে এক প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছিল। আর সেই প্রতিবেদনে অভিযুক্তদের তালিকায় শিতাংশু শেখর বিশ্বাসেরও নাম উঠে আসে। তিনি তখন বরিশাল বিআরটিএ এর সহকারী পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এরপর মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে তাকে ও এস ডি করা হয়। এখন তার অন্যতম সহযোগি টাইগার আইটির ম্যানেজার আল-আমিন, ফরহাদ হোসেন ও দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের ইকুরিয়ার টাইগার আইটির ম্যানেজার বিপ্লব কুমার বিশ্বাস। এই বিপ্লব কুমার বিশ্বাস এখন বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিআরটিএর একজন কর্মকর্তা জানান, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের প্রতিষ্ঠান ‘সিএনএস’ এর সাথেও শিতাংশু শেখর বিশ্বাস, তার ভায়রা বিপ্লব কুমার বিশ্বাস, ফরহাদ হোসেন ও ডমিনিক ফালিয়াসহ শক্তিশালী চক্রের কমিশন বাণিজ্য ছিল। লাইসেন্স প্রিন্টিংয়ের কাজ এ সরকারি সংস্থার সক্ষমতা না থাকায় টেন্ডার বাতিল করে সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের প্রতিষ্ঠানকে টেন্ডারের কাজ দেয়া হয়। ঘটনাটি সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ হলে বিআরটিএ কর্র্তৃপক্ষ সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের প্রতিষ্ঠান ‘সিএনএস’ এর টেন্ডার বাতিল করে। আর শিতাংশু শেখর বিশ্বাসকে শাস্তিস্বরূপ পরিচালক (ইঞ্জিঃ) থেকে রোড সেফটি তে দায়িত্ব প্রদান করা হয়। আগামি ৩১ ডিসেম্বর শিতাংশু শেখ বিশ্বাস অবসরে যাবেন বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে মিরপুর-১৩ বিআরটিএ কর্মরত টাইগার আইটির ম্যানেজার আল-আমিন সকালের সময়কে বলেন, আমি দীর্ঘ দিন ধরেই এখানে কর্মরত। তাই আমার প্রতিপক্ষ থাকতেই পারে। তারাই আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি। উত্তরা বিআরটিএর টাইগার আইটির ম্যানেজার ফরহাদ হোসেন সকালের সময়কে বলেন, তিনি গত ২০২০ সালে মিরপুরে আছেন। বিআরটিএর পরিচালকের সঙ্গে দুর্নীতি অনিয়মে জড়িত হওয়ার বিষয়ে তার সেল ফোনে জানতে চাইলে তিনি তার ফোনটি বন্ধ করে দেন। আর ডমিনিক ফালিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সকালের সময়কে বলেন, তার বিরুদ্ধে যে দুর্নীতি দমন ব্যুরোতে অভিযোগ করা হয়েছে। সেই বিষয়টি তিনি জানতে পেরেছেন। আর অভিযোগগুলোর বিষয়ে বলেন, আমার বিষয়টি আমি ত মিথ্যা বলবো। তবে অফিসে এসে যদি অন্যান্যদের বিষয়ে তদন্ত করা হতো, তাহলেই কতটুকু সত্য আর মিথ্যা তা বোঝা যেত।
নিজস্ব প্রতিবেদক
২-৯-২০২৫ দুপুর ৩:৫৯
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) বহুল আলোচিত পরিচালক (রোড সেফটি) শিতাংশু শেখর বিশ্বাসের ভায়রা বিপ্লব কুমার বিশ্বাস ও রাজধানীর উত্তরা (বিআরটিএ) টাইগার আইটি ম্যানেজার ফরহাদ হোসেন ; ডমিনিক ফালিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব দুর্নীতি অনিয়মের বিষয়ে তদন্তপূর্বক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ অটোরিকসা, অটোটেম্পু শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মো. জামাল আকন দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ করেছেন।
জানা গেছে, আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট (আইটি আই আই ইউ) জালিয়াতি চক্রের নায়ক শিতাংশু শেখর বিশ্বাসের ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ হওয়ার তথ্য ফাঁসের পর তার সহযোগিদের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছেন। ‘দৈনিক সকালের সময় গত ২৯ আগস্ট স্বৈরাচার সরকারের দোসর শিতাংশু -আলামিন সিন্ডিকেটের কাছে সেবা প্রত্যাশিরা জিম্মি’ শিরোনামে এক প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পর মিরপুর বিআরটিএর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। শিতাংশু ও আল আমিনের নানা অনিয়ম দুর্নীতির তথ্য এবং তাদের কাছে সেবা প্রত্যাশিদের হয়রানীর কথা জানিয়েছেন।
সূত্র জানায়, কালো তালিকাভুক্ত টাইগার আইটি সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাসিনার নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকীর ছত্র-ছায়ায় বিআরটিএর প্রকল্পে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর অফিসের (পিএমও) দাপটে কোনো বিআরটিএ অফিসার দীর্ঘ দিন মুখ খোলেননি। এই সিন্ডিকেটের নায়ক বিপ্লব কুমার বিশ্বাস ও ফরহাদ হোসেন ও ডমিনিক ফালিয়া চক্রের জাল জালিয়াতি অবৈধ ও ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স ঠেকাতে ২০১১ সালে ইলেকট্রনিক চিপযুক্ত ডিজিটাল স্মার্টকার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রবর্তন করা হয়। আধুনিক প্রযুক্তির এই টাইগার আইটি-ই শুরু থেকেই বিআরটিএ প্রকল্পে যুক্ত ছিল। বিশ্বব্যাংকের কালো তালিকাভুক্ত হওয়া গত ২০১৯ সালের আগস্টে ‘টাইগার আইটি’র সঙ্গে বিআরটিএর চুক্তি বাতিল করে। এটা এক ধরনের আইওয়াশ ছিল মাত্র। এরপর নতুন টেন্ডার করে মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্সকে নিয়োগ দিলেও চুক্তির মেয়াদ গত ২০২১-এর জুন পর্যন্ত স্মার্টকার্ডের সার্ভার এবং ডেটাবেজ হস্তান্তর করতে গড়িমসি করতে থাকে। গত ২০২০ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি টেন্ডার ছাড়াই ৪ লাখ ডিজিটাল স্মার্টকার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্স কিনতে ১৮ দশমিক ৯ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হাসিনার মন্ত্রিসভা। আর প্রতিটি লাইসেন্স প্রায় ১০ গুণ বেশি দামে উচ্চাপর্যায়ের নির্দেশে তা কেনা হয়। এর জন্য প্রতিটি স্মার্টকার্ডের বাজারমূল্য ৫০ টাকা হলেও প্রকল্পে প্রায় ৫০০ টাকা (৪৭২.৬০ টাকা) করে কেনা হয়। আগের বছরগুলো ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যুর পরিসংখ্যান ও সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ চাহিদা বিবেচনা করে প্রতি বছর গড়ে ৩ লাখ স্মার্টকার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রয়োজন হয়। এর পুরোটাই টাইগার আইটি সরবরাহ করে আসছে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে। তৎকালীন টাইগার আইটির চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমান এখন বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন বলে জানা গেছে।
এদিকে রাজধানীর মিরপুর-১৩ বিআরটিএ কর্মরত টাইগার আইটির ম্যানেজার আল-আমিন এর আধিপত্য নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকেই তার সিন্ডিকেটের সদস্যরা তৎপরতা শুরু করেছে। স্বৈরাচারী ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় গড়ে তোলা দালাল চক্রের গডফাদার হিসেবে তিনি এখনো আধিপত্য বিস্তার করে আসছেন। তার নেতৃত্বে প্রায় শতাধিক দালাল দালালীর কাছে ব্যস্ত থাকছেন। তাদের দিয়ে প্রতিদিন নানা জালিয়াতিসহ সেবা প্রত্যাশীদের হয়রানী ছাড়াও ‘মব’ সৃষ্টি করা হচ্ছে। মিরপুরে বিআরটিএ-১৩ এর কার্যালয়ে মাঝে মধ্যে যৌথ বাহিনী অভিযান চালিয়ে দালালদের আটক করছে। মোবাইল কোর্ট বসিয়েও জেল জরিমানা করা হচ্ছে। তারপরও টাইগার আইটির আল আমীন বাহিনীর তাণ্ডব থামছে না। দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের ম্যানেজার বিপ্লব কুমার বিশ্বাস ইকুরিয়ায় এক বাহিনী গড়ে তুলেছেন। সেখানে তিনি দীর্ঘ ৮ বছর ধরে আছেন। অতিদ্রুতম সময়ের মধ্যে তাকে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া না হলে যে কোন সময় সেবা প্রত্যাশীরা প্রতিরোধ করবেন বলেও ভুক্তভোগিরা জানিয়েছেন।
জানা গেছে, রাজধানীর উত্তরা বিআরটিএর টাইগার আইটির ম্যানেজার ফরহাদ হোসেন ও মিরপুরের টাইগার আইটির ম্যানেজার আল-আমিন চাকরির প্রথম জীবনে দুই একটি বাসার সাবলেট হিসাবে মেসে ভাড়া থাকতেন। এখন তারা দুজনের বিআরটিএর জাল জালিয়াতির মাধ্যমে কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। এই স্বল্প বেতনে চাকরি করে এত টাকার মালিক কিভাবে হলেন, তা নিয়ে তাদের পরিচিতজন ও প্রতিবেশীদের মধ্যে আলোচনা সমালোচনার ঝড় বইছে। মিরপুর-১৩ এর বিএরটিএর টাইগার আইটির ম্যানেজার আল-আমিন তার স্ত্রীকে নিয়ে মাঝে মধ্যেই বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। সাবেক সরকারের পতনের পর তিনি স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য জার্মানিতে পাড়ি জমাবেন বলে তার পরিচিতজনের বলা বলি করছেন। অনেক ভুক্তভোগীরা বলছেন, ফরহাদ ও বিআরটিএর পরিচালক শীতাংশু শেখর বিশ্বাসের ভায়রা; দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ বিআরটিএর টাইগার আইটি’র ম্যানেজার বিপ্লব কুমার বিশ্বাস দীর্ঘ ৮ বছর ধরে একই জায়গায় রয়েছেন। তিনি শিতাংশু শেখর বিশ্বাসের পরিচয়ে একক আধিপত্য বিস্তার করে কয়েক কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। ব্যাংক হিসাবসহ সম্পদের খোঁজ নিলে আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হওয়ার প্রমাণ মিলবে বলে ভুক্তভোগিরা জানিয়ছেন। আর জালিয়াতির সিণ্ডিকেটের অন্যতম সদস্য বিপ্লব কুমার বিশ্বাস ও ফরহাদ নিজেদের এবং তাদের আত্মীয়-স্বজনের নামে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন।
সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পর এক যুগের বেশি সময় ধরে বিআরটিএতে বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ পেয়ে আসছে একটি দুর্নীতি গ্রস্ত কালো তালিকার প্রতিষ্ঠান টাইগার আইটি। সক্ষমতা থাকলেও বিআরটিএর আরএফআইডি স্মার্টকার্ড প্রকল্পে টাইগার আইটির সঙ্গে দেশীয় কোন প্রতিষ্ঠান যায়নি। তখন শিতাংশু শেখর বিশ্বাস তারেক সিদ্দিকী ও সজিব ওয়াজেদ জয় এর প্রভাব খাটিয়েছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে কোনো প্রকার প্রতিযোগিতা ব্যতিত কাজ পেতো টাইগার আইটি।
টাইগার আইটির চেয়ারম্যানের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা থাকায় ওরাকল, সিসকোর মতো মার্কিন প্রতিষ্ঠান টাইগার আইটির সঙ্গে কাজ করা বন্ধ করে দেয়। নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে কাজ করতে ইউরোপের কয়েকটি শেলকোম্পানিসহ কয়েকটি কোম্পানীর সঙ্গে চুক্তি করে, প্রকৃতপক্ষে মুদ্রা পাচারের জন্য চুক্তিগুলো করা হয়েছিল। এছাড়া নির্বাচন কমিশন, ঢাকা ওয়াসা, পাসপোর্ট অধিদপ্তর, এনআইডি অনুবিভাগের বিভিন্ন প্রকল্প থেকে বাংলাদেশে আইবিসিএস-প্রাইমেক্স নামে ছদ্মবেশী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কয়েক শ কোটি টাকার কাজ করেছে টাইগার আইটি। নির্বাচন কমিশনের স্মার্টকার্ড মুদ্রণ-সংক্রান্ত বিশ্বব্যাংকের প্রকল্পেও দুর্নীতি প্রমাণিত হয়েছে টাইগার আইটির বিরুদ্ধে। দুর্নীতির অভিযোগে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান টাইগার আইটিকে ২০১৯ সালে সাড়ে ৯ বছরের জন্য এবং প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমানকে সাড়ে ৬ বছরের জন্য কালো তালিকাভুক্ত করে। তারপরও বিআরটিএতে টাইগার আইটির আধিপত্য বিস্তার করে। বিআরটিএর স্মার্টকার্ডসহ সরকারি প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেন পলাতক তারিক আহমেদ সিদ্দিকের স্ত্রী শাহনাজ সিদ্দিক। তিনি ভারতীয় একটি চক্রের মাধ্যমে এখনো চেষ্টা করছেন। বিভিন্ন কোম্পানির নামে পুরো প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ টাইগার আইটি করছেন। অথচ কালো তালিকাভুক্ত হিসেবে ২০২৭ সাল পর্যন্ত বিশ্বব্যাংকের কোনো টেন্ডারে অংশ নিতে পারবে না টাইগার আইটি।
পলাতক শেখ হাসিনার নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক ও সাবেক সড়ক পরিবহন এবং সেতুমন্ত্রী ওয়াবদুল কাদেরের প্রভাব খাটিয়ে বিআরটিএর এ প্রকল্পের কাজ করতে কোনো টেন্ডার ও যাচাই-বাছাই করতে হয়নি। এতে সরকারি কাজে বিআরটিএর প্রকল্পকে কুক্ষিগত করে বছরের পর বছর কাজ পেয়ে আসছে টাইগার আইটি। আর এই টাইগার আইটির ম্যানেজার আল আমিন একক আধিপত্য বিস্তার করে আসছেন।
উল্লেখ্য, গত ২০০৮ সালে তৎকালীন যোগাযোগ মন্ত্রণালয় বিআরটিএ এর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত করে এক প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছিল। আর সেই প্রতিবেদনে অভিযুক্তদের তালিকায় শিতাংশু শেখর বিশ্বাসেরও নাম উঠে আসে। তিনি তখন বরিশাল বিআরটিএ এর সহকারী পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এরপর মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে তাকে ও এস ডি করা হয়। এখন তার অন্যতম সহযোগি টাইগার আইটির ম্যানেজার আল-আমিন, ফরহাদ হোসেন ও দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের ইকুরিয়ার টাইগার আইটির ম্যানেজার বিপ্লব কুমার বিশ্বাস। এই বিপ্লব কুমার বিশ্বাস এখন বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিআরটিএর একজন কর্মকর্তা জানান, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের প্রতিষ্ঠান ‘সিএনএস’ এর সাথেও শিতাংশু শেখর বিশ্বাস, তার ভায়রা বিপ্লব কুমার বিশ্বাস, ফরহাদ হোসেন ও ডমিনিক ফালিয়াসহ শক্তিশালী চক্রের কমিশন বাণিজ্য ছিল। লাইসেন্স প্রিন্টিংয়ের কাজ এ সরকারি সংস্থার সক্ষমতা না থাকায় টেন্ডার বাতিল করে সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের প্রতিষ্ঠানকে টেন্ডারের কাজ দেয়া হয়। ঘটনাটি সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ হলে বিআরটিএ কর্র্তৃপক্ষ সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের প্রতিষ্ঠান ‘সিএনএস’ এর টেন্ডার বাতিল করে। আর শিতাংশু শেখর বিশ্বাসকে শাস্তিস্বরূপ পরিচালক (ইঞ্জিঃ) থেকে রোড সেফটি তে দায়িত্ব প্রদান করা হয়। আগামি ৩১ ডিসেম্বর শিতাংশু শেখ বিশ্বাস অবসরে যাবেন বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে মিরপুর-১৩ বিআরটিএ কর্মরত টাইগার আইটির ম্যানেজার আল-আমিন সকালের সময়কে বলেন, আমি দীর্ঘ দিন ধরেই এখানে কর্মরত। তাই আমার প্রতিপক্ষ থাকতেই পারে। তারাই আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি। উত্তরা বিআরটিএর টাইগার আইটির ম্যানেজার ফরহাদ হোসেন সকালের সময়কে বলেন, তিনি গত ২০২০ সালে মিরপুরে আছেন। বিআরটিএর পরিচালকের সঙ্গে দুর্নীতি অনিয়মে জড়িত হওয়ার বিষয়ে তার সেল ফোনে জানতে চাইলে তিনি তার ফোনটি বন্ধ করে দেন। আর ডমিনিক ফালিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সকালের সময়কে বলেন, তার বিরুদ্ধে যে দুর্নীতি দমন ব্যুরোতে অভিযোগ করা হয়েছে। সেই বিষয়টি তিনি জানতে পেরেছেন। আর অভিযোগগুলোর বিষয়ে বলেন, আমার বিষয়টি আমি ত মিথ্যা বলবো। তবে অফিসে এসে যদি অন্যান্যদের বিষয়ে তদন্ত করা হতো, তাহলেই কতটুকু সত্য আর মিথ্যা তা বোঝা যেত।