শিরোনামঃ
এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী বেলালকে ঘিরে বিতর্ক শিল্পের পথেই আতিকা আফসানা চট্টগ্রাম হালিশহর বিআরটিএতে ফিটনেস বাণিজ্যের অভিযোগ দুর্নীতির আখড়া মুন্সীগঞ্জ সদর: পঁঞ্চসার ইউপি কর্মকর্তার আঙুল ফুলে কলাগাছ মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানী সিন্ডিকেট প্রধান স্বপনের ৫০০ কোটি টাকার সম্পত্তি ক্রোক ‎আওয়ামী সিন্ডিকেটের কবলে এলজিইডি: প্রশাসনের চরম অস্থিরতা চট্টগ্রাম বন একাডেমির পরিচালক আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য কমিটিতে বিতর্কিতদের দাপট: তৃণমূলের তীব্র ক্ষোভ চট্টগ্রাম বন্দরের টেন্ডারে অনিয়ম, শর্তে ‘ভূতুড়ে ম্যাজিক’ বিসিএস ছাড়াই ৬ষ্ঠ গ্রেডে নিয়োগ, আদালতের স্থগিতাদেশও উপেক্ষা সহ বিস্ফোরক দুর্নীতি

চট্টগ্রাম বন্দরের টেন্ডারে অনিয়ম, শর্তে ‘ভূতুড়ে ম্যাজিক’

#
news image

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নৌ-প্রকৌশল বিভাগের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কৌশলে কাজ পাইয়ে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্তরা হলেন নির্বাহী প্রকৌশলী (মেরিন) পদে অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী মো. জসিম উদ্দিন ও জলযান শাখায় অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আফছার উদ্দিন। 

ঠিকাদার ও অভিযোগ সূত্রের বরাতে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে নানা কৌশলে তারা সরকারি ক্রয়নীতি পিপিআর-২০০৮ লঙ্ঘন করে আসছেন এবং বন্দরের প্রশাসনিক বিভাগের নীরবতায় সেসব অনিয়ম চলছে বছরের পর বছর।

অভিযোগের মূল চিত্রটি শুরু হয় টেন্ডারের আগেই। জানা গেছে, তারা ওটিএম ও ই-জিপি টেন্ডার পদ্ধতিতে পছন্দের কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে গোপনে রেটকোড সরবরাহ করেন। মোটা অঙ্কের বিনিময়ে এই তথ্য ফাঁস করে দেওয়া হয়, ফলে ওই ঠিকাদাররা কাজের মূল্যসীমা আগে থেকেই জেনে যান এবং নিখুঁত দর দিয়ে টেন্ডার জিতে নেন। 

সাধারণ ঠিকাদাররা পে-অর্ডার ও সিডিউল কিনে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এ দুই কর্মকর্তার পছন্দের প্রতিষ্ঠানটি কোটি কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নেয়।
তবে রেটকোড ফাঁসই তাদের একমাত্র কৌশল নয়। আরও জটিল ও অভিনব পদ্ধতি হলো দরপত্রের শর্তগুলোকে স্ববিরোধী ও অপ্রয়োজনীয়ভাবে কঠিন করে তোলা। অভিযোগে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য ছোট কাজে বড় সনদ চাওয়া হয়, আবার বড় কাজে সেসব সনদ লাগে না। যেমন স্টোর রেক সম্পাদনের মতো নিতান্তই ছোট কাজের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবিসি সনদ, অথচ বন্দরের অনেক বড় উন্নয়ন কাজেও এই সনদ চাওয়া হয় না। 

একই চিত্র দেখা যায় আইএসও সনদের ক্ষেত্রে। পল্টুন বার্জ-২০ নামের একটি ছোট মেরামতের কাজে আইএসও সনদ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, কিন্তু পল্টুন বার্জ-২-এর কাজে মেরামতে কাজে তেমন শর্ত আরোপ করে নাই।

আবার ছোট আকারের জরিপ স্টিয়ারিং সিস্টেম উইঞ্জ মেরামত ও জরিপ-১০ ইঞ্জিন ওভারহোলিংয়ের মতো কাজে আবশ্যক করা হয়েছে পিওএমএমডি সার্টিফিকেট ও ইমপোর্ট রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট (আইআরসি), অথচ মেরামতের অনেক বড় কাজেও এসব ডকুমেন্ট লাগে নাই স্থানীয় ডিলারের পণ্য সরবরাহের সুযোগ দেওয়া হয়, যেখানে এসব সনদ লাগে না। এই অসঙ্গতি শুধু একটি-দুটি কাজে নয়, বন্দরের নৌ-প্রকৌশল বিভাগের প্রায় প্রতিটি দরপত্রেই ছড়িয়ে আছে।

একই ধরনের বৈপরীত্য দেখা যায় জরিপ ১০ জাহাজ মেরামত সংক্রান্ত কাজগুলোতেও। কান্ডারি-৭ পপুলার শেফট মেরামত ও মালামাল সরবরাহ কাজের জন্য এক ধরনের সহজ শর্ত থাকলে, একই স্থানের জরিপ ১০ ডকিং মেরামতের কাজে আরেক ধরনের শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়। কাজের প্রকৃতি ও মিল থাকলেও শর্তের মধ্যে কোনো সঙ্গতি রাখা হয় না। 

আরও সুনির্দিষ্ট উদাহরণ হলো, গত বছর প্লেট সরবরাহ ও গেট বাল্ব সরবরাহের এক টেন্ডারে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দিতে না পেরে সম্পূর্ণ দরপত্র বাতিল করে নতুন করে শর্ত সাজিয়ে সেই পছন্দের প্রতিষ্ঠানকেই কাজটি তুলে দেওয়া জন্য ম্যানুয়াল টেন্ডার আহব্বান করা হয়। ঠিকাদারদের ভাষায়, এভাবে তারা নিজেরাই একটি সুসংহত সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন।

অভিযোগের আরেকটি দিক হলো অভিজ্ঞতার শর্ত নিয়েও নানা কারসাজি। জানা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে কার্যাদেশে একক ওয়ার্ক অর্ডারের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ থাকলেও যেসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হচ্ছে, তাদের সেই অভিজ্ঞতা নেই। পিপিআর আইনে যা বাধ্যতামূলক নয়, অথচ কর্মকর্তারা ইচ্ছেমতো শর্ত সংযোজন ও বিয়োজন করেন।

তারা ই-টেন্ডারের সঙ্গে অতিরিক্ত নথিপত্র হিসেবে এবিসি সনদ দাখিলের নির্দেশ দিচ্ছেন ছোট কাজে, যেখানে যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণ নেই। এই অভিযোগ এতটাই জোরালো যে একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আহ্বানকৃত টেন্ডারগুলোর শর্ত সহজীকরণের জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদন জানিয়েছেন।

সবচেয়ে দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, দীর্ঘদিন এ সব অনিয়মের পরও কর্তৃপক্ষ নির্বিকার। বছরের পর বছর ধরে ঠিকাদাররা উচ্চ মহলে অভিযোগ জানালেও সেগুলো আমলেই নেওয়া হয় না। তদন্তের নাম নেই, শাস্তিমূলক ব্যবস্থার তো প্রশ্নই ওঠে না। হতাশ ঠিকাদারদের একাংশ এখন দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) নজর দেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন। এমনকি পূর্ববর্তী ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলের কিছু পলাতক ঠিকাদারকেও নানা কৌশলে কাজ পাইয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, যার সত্যতাত যাচাই জরুরি।

এ বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রশাসন) মো. ওমর ফারুক, প্রকৌশলী মোহাম্মদ আফছার উদ্দিন ও নির্বাহী প্রকৌশলী (মেরিন) পদে অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী মো. জসিম উদ্দিনের মোবাইলে কল ও বার্তা দিয়েও কোন জবাব পাওয়া যায়নি। 
তবে যে অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে, তাতে প্রশাসনিক তদন্ত ও দুদকের সক্রিয় ভূমিকা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নিজস্ব প্রতিবেদক

১৬-৫-২০২৬ রাত ৯:১৬

news image

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নৌ-প্রকৌশল বিভাগের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কৌশলে কাজ পাইয়ে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্তরা হলেন নির্বাহী প্রকৌশলী (মেরিন) পদে অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী মো. জসিম উদ্দিন ও জলযান শাখায় অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আফছার উদ্দিন। 

ঠিকাদার ও অভিযোগ সূত্রের বরাতে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে নানা কৌশলে তারা সরকারি ক্রয়নীতি পিপিআর-২০০৮ লঙ্ঘন করে আসছেন এবং বন্দরের প্রশাসনিক বিভাগের নীরবতায় সেসব অনিয়ম চলছে বছরের পর বছর।

অভিযোগের মূল চিত্রটি শুরু হয় টেন্ডারের আগেই। জানা গেছে, তারা ওটিএম ও ই-জিপি টেন্ডার পদ্ধতিতে পছন্দের কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে গোপনে রেটকোড সরবরাহ করেন। মোটা অঙ্কের বিনিময়ে এই তথ্য ফাঁস করে দেওয়া হয়, ফলে ওই ঠিকাদাররা কাজের মূল্যসীমা আগে থেকেই জেনে যান এবং নিখুঁত দর দিয়ে টেন্ডার জিতে নেন। 

সাধারণ ঠিকাদাররা পে-অর্ডার ও সিডিউল কিনে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এ দুই কর্মকর্তার পছন্দের প্রতিষ্ঠানটি কোটি কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নেয়।
তবে রেটকোড ফাঁসই তাদের একমাত্র কৌশল নয়। আরও জটিল ও অভিনব পদ্ধতি হলো দরপত্রের শর্তগুলোকে স্ববিরোধী ও অপ্রয়োজনীয়ভাবে কঠিন করে তোলা। অভিযোগে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য ছোট কাজে বড় সনদ চাওয়া হয়, আবার বড় কাজে সেসব সনদ লাগে না। যেমন স্টোর রেক সম্পাদনের মতো নিতান্তই ছোট কাজের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবিসি সনদ, অথচ বন্দরের অনেক বড় উন্নয়ন কাজেও এই সনদ চাওয়া হয় না। 

একই চিত্র দেখা যায় আইএসও সনদের ক্ষেত্রে। পল্টুন বার্জ-২০ নামের একটি ছোট মেরামতের কাজে আইএসও সনদ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, কিন্তু পল্টুন বার্জ-২-এর কাজে মেরামতে কাজে তেমন শর্ত আরোপ করে নাই।

আবার ছোট আকারের জরিপ স্টিয়ারিং সিস্টেম উইঞ্জ মেরামত ও জরিপ-১০ ইঞ্জিন ওভারহোলিংয়ের মতো কাজে আবশ্যক করা হয়েছে পিওএমএমডি সার্টিফিকেট ও ইমপোর্ট রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট (আইআরসি), অথচ মেরামতের অনেক বড় কাজেও এসব ডকুমেন্ট লাগে নাই স্থানীয় ডিলারের পণ্য সরবরাহের সুযোগ দেওয়া হয়, যেখানে এসব সনদ লাগে না। এই অসঙ্গতি শুধু একটি-দুটি কাজে নয়, বন্দরের নৌ-প্রকৌশল বিভাগের প্রায় প্রতিটি দরপত্রেই ছড়িয়ে আছে।

একই ধরনের বৈপরীত্য দেখা যায় জরিপ ১০ জাহাজ মেরামত সংক্রান্ত কাজগুলোতেও। কান্ডারি-৭ পপুলার শেফট মেরামত ও মালামাল সরবরাহ কাজের জন্য এক ধরনের সহজ শর্ত থাকলে, একই স্থানের জরিপ ১০ ডকিং মেরামতের কাজে আরেক ধরনের শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়। কাজের প্রকৃতি ও মিল থাকলেও শর্তের মধ্যে কোনো সঙ্গতি রাখা হয় না। 

আরও সুনির্দিষ্ট উদাহরণ হলো, গত বছর প্লেট সরবরাহ ও গেট বাল্ব সরবরাহের এক টেন্ডারে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দিতে না পেরে সম্পূর্ণ দরপত্র বাতিল করে নতুন করে শর্ত সাজিয়ে সেই পছন্দের প্রতিষ্ঠানকেই কাজটি তুলে দেওয়া জন্য ম্যানুয়াল টেন্ডার আহব্বান করা হয়। ঠিকাদারদের ভাষায়, এভাবে তারা নিজেরাই একটি সুসংহত সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন।

অভিযোগের আরেকটি দিক হলো অভিজ্ঞতার শর্ত নিয়েও নানা কারসাজি। জানা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে কার্যাদেশে একক ওয়ার্ক অর্ডারের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ থাকলেও যেসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হচ্ছে, তাদের সেই অভিজ্ঞতা নেই। পিপিআর আইনে যা বাধ্যতামূলক নয়, অথচ কর্মকর্তারা ইচ্ছেমতো শর্ত সংযোজন ও বিয়োজন করেন।

তারা ই-টেন্ডারের সঙ্গে অতিরিক্ত নথিপত্র হিসেবে এবিসি সনদ দাখিলের নির্দেশ দিচ্ছেন ছোট কাজে, যেখানে যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণ নেই। এই অভিযোগ এতটাই জোরালো যে একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আহ্বানকৃত টেন্ডারগুলোর শর্ত সহজীকরণের জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদন জানিয়েছেন।

সবচেয়ে দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, দীর্ঘদিন এ সব অনিয়মের পরও কর্তৃপক্ষ নির্বিকার। বছরের পর বছর ধরে ঠিকাদাররা উচ্চ মহলে অভিযোগ জানালেও সেগুলো আমলেই নেওয়া হয় না। তদন্তের নাম নেই, শাস্তিমূলক ব্যবস্থার তো প্রশ্নই ওঠে না। হতাশ ঠিকাদারদের একাংশ এখন দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) নজর দেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন। এমনকি পূর্ববর্তী ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলের কিছু পলাতক ঠিকাদারকেও নানা কৌশলে কাজ পাইয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, যার সত্যতাত যাচাই জরুরি।

এ বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রশাসন) মো. ওমর ফারুক, প্রকৌশলী মোহাম্মদ আফছার উদ্দিন ও নির্বাহী প্রকৌশলী (মেরিন) পদে অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী মো. জসিম উদ্দিনের মোবাইলে কল ও বার্তা দিয়েও কোন জবাব পাওয়া যায়নি। 
তবে যে অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে, তাতে প্রশাসনিক তদন্ত ও দুদকের সক্রিয় ভূমিকা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।