শিরোনামঃ
‎আওয়ামী সিন্ডিকেটের কবলে এলজিইডি চট্টগ্রাম বন একাডেমির পরিচালক আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য কমিটিতে বিতর্কিতদের দাপট: তৃণমূলের তীব্র ক্ষোভ চট্টগ্রাম বন্দরের টেন্ডারে অনিয়ম, শর্তে ‘ভূতুড়ে ম্যাজিক’ বিসিএস ছাড়াই ৬ষ্ঠ গ্রেডে নিয়োগ, আদালতের স্থগিতাদেশও উপেক্ষা সহ বিস্ফোরক দুর্নীতি বিআরটিএর চট্ট্রগ্রাম মেট্রো-২ এ ঘুষ আদায়ের সিন্ডিকেট : উপ-পরিচালক সানাউক হকের ১২ সদস্য সক্রিয় সন্ত্রাসী কবির মুসার বিরুদ্ধে আরো একটি হত্যা মামলা দায়ের আওয়ামী সরকারের জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরাদের আশীর্বাদ পুষ্ট আলাউদ্দিনকে ফায়ার সার্ভিসে নিয়োগ বসন্তের কোকিলরা ফিরছে: উত্তরাতে রাজনৈতিক সমীকরণ বদল ছাত্রদের সৎ, চরিত্রবান ও দেশ প্রেমে উদ্যোগী হতে হবে : নূর হাকিম

‎আওয়ামী সিন্ডিকেটের কবলে এলজিইডি

#
news image

‎আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দীর্ঘ সময় পার হলেও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) এখনও কাটেনি আওয়ামী লীগপন্থি ও বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের নেতাদের আধিপত্য। বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতায় গুরুত্ব দিয়েছেন। কিন্তু তারপরও আওয়ামী সিন্ডিকেটের কারণে পরিবর্তন ঘটেনি এলজিইডিতে। জানা গেছে, এর মূল হোতা নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলাম, যিনি ‘রংধনু শফিক’ নামে ইতোমধ্যে পরিচিত লাভ করেছেন অধিদপ্তরে। তার ইশারা ছাড়া কোনো ফাইল নড়ে না। তিনি টাকার বিনিময়ে বদলি ও পদায়ন বাণিজ্য চালান। তার অপকর্মের প্রতিবাদ করলে প্রতিবাদকারীকে দেওয়া হয় শাস্তিমূলক বদলি। শফিকুল ইসলামই এলজিইডিতে আওয়ামীপন্থিদের পুনর্বাসনের প্রধান কারিগর। 

‎সূত্রমতে, এলজিইডির নিয়োগ ও পদায়ন শাখাকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী চক্র সক্রিয় রয়েছে। এই চক্র এলজিইডিতে বিভিন্ন পদে বদলি ও পদায়নে প্রভাব বিস্তার করছে। সিন্ডিকেটের মূল হোতা হিসেবে কাজ করছেন এলজিইডির নিয়োগ ও পদায়ন শাখার দায়িত্বে থাকা নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. শফিকুল ইসলাম। সরকার পতনের পর এখনও আওয়ামী লীগের আধিপত্য ধরে রেখেছেন শফিকুল ইসলাম। সংস্থায় বদলি, পদায়নে তার একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে বলে জানা গেছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে তিনি এখন এলজিইডির ‘রংধনু শফিক’ নামে পরিচিত। আওয়ামী লীগ মতাদর্শী এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বর্তমানে বহাল থাকা আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী প্রকৌশলীদের আশ্রয় দেওয়া, ইন্ধন জোগানো এবং কোটি কোটি টাকার বদলি-বাণিজ্যের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে।

‎মো. শফিকুল ইসলাম ২০১১ সালে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করে আদালতের মামলার মাধ্যমে এলজিইডির রাজস্ব খাতে নিয়োগ পান। হবিগঞ্জ জেলায় দীর্ঘ ১১ বছর সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী থাকাকালীন তিনি সহকর্মীদের কাছে নিজ জেলা নওগাঁ থেকে আওয়ামী লীগের টিকিটে এমপি নির্বাচন করার ইচ্ছার কথা জানান- এই দাবি তার তৎকালীন সহকর্মীদের।

‎২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শফিকুল রাতারাতি খোলস পাল্টে ফেলেন। বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের তৎকালীন সভাপতি ও সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. আলী আখতার হোসেনকে ম্যানেজ করে তিনি এলজিইডি সদর দপ্তরের প্রশাসন শাখায় পোস্টিং নেন। এরপর একাধিক প্রধান প্রকৌশলী পরিবর্তন হলেও বহাল তবিয়তে রয়ে গেছেন শফিকুল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৭ জন প্রধান প্রকৌশলীর অধীনে একই পদে বহাল রয়েছেন তিনি। যেকোনো পরিস্থিতিতে রঙ বদলাতে পারদর্শী হওয়ায় অধিদপ্তরে তাকে এলজিইডির ‘রংধনু শফিক’ বলে ডাকা হয়।

‎মন্ত্রণালয় এবং সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নাম ভাঙিয়ে এলজিইডির প্রশাসনকে জিম্মি করে রেখেছেন শফিকুল ইসলাম। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলজিইডির এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এবং সচিব মো. শহিদুল হাসানকে ম্যানেজ করার দাবি করেই শফিকুল এই বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। বিভিন্ন জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী, উপজেলা প্রকৌশলী এবং সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলীদের লোভনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে বদলি করার নামে তিনি শুরু করেছেন প্রকাশ্য নিলাম প্রক্রিয়া।

‎সম্প্রতি এই সিন্ডিকেটের কিছু সুনির্দিষ্ট বদলি-বাণিজ্যের তথ্য পাওয়া গেছে। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে পদায়ন করে মোটা অঙ্কের অর্থ তোলার অভিযোগ উঠেছে। সাভার, কেরানীগঞ্জ, ধামরাই উপজেলা প্রকৌশলী এবং ঢাকা, টাঙ্গাইল ও কক্সবাজার জেলার সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী পদে বদলির ক্ষেত্রে জনপ্রতি ১০ লাখ টাকারও বেশি আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।

‎পদোন্নতি-বাণিজ্য : এলজিইডির ১৯৭ জন নির্বাহী প্রকৌশলীর পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় জনপ্রতি ৫ লাখ টাকা এবং সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলীদের পদোন্নতিতেও বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি।

‎প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগ : বড় বড় প্রকল্পের পিডি হিসেবে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের নেতাদের নাম প্রস্তাবের পেছনেও রয়েছে শফিকুলের মদদ। যেমন আরসিআইপি প্রকল্পের পিডি (চুয়েটের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা কামরুল ইসলাম) এবং নগর উন্নয়ন প্রকল্পের পিডি (ডুয়েটের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ) এখনও বহাল তবিয়তে আছেন তারই বদৌলতে। এমনকি সিআইবিআরআর-২ প্রকল্পের পিডি হিসেবে বুয়েটের সাবেক ছাত্রদল-সংশ্লিষ্ট এক প্রকৌশলীর ফাইল চূড়ান্ত হওয়ার পরও তাকে বাদ দিয়ে বিপুল অর্থের বিনিময়ে সাবেক মন্ত্রী তাজুল ইসলামের আশীর্বাদপুষ্ট ও পলাতক আওয়ামী ঠিকাদারের জামাতাকে পিডি বানানোর প্রস্তাব পাঠান শফিকুল।

‎নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলজিইডির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, শফিকুল ইসলামের ইশারা ছাড়া এলজিইডিতে এখন একটা ফাইলও নড়ে না। বদলি বা ভালো প্রজেক্টে পোস্টিং পেতে হলে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা তার সিন্ডিকেটের কাছে পৌঁছাতেই হবে। যারা প্রতিবাদ করছেন, তাদের ঢাকার বাইরে শাস্তিমূলক বদলি বা নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে।

‎সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে রাজনৈতিক পুনর্বাসন নিয়ে। শফিকুল ইসলাম কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ-মতাদর্শী কর্মকর্তাদের ঢাল হিসেবে কাজ করছেন। তারাই তার মূল শক্তি। এ কারণেই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও এলজিইডিতে বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের সুবিধাভোগী এবং আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন ‘বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের’ সক্রিয় সদস্যদের দাপট কমেনি।

‎অভিযোগ রয়েছে, এলজিইডির ঢাকা জেলার বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরিফুজ্জামান, যিনি বিগত আওয়ামী সরকারের সময় শেখ হেলালের আত্মীয় পরিচয়ে বাগেরহাটে ৫ বছর দাপটের সঙ্গে কাজ করেছেন এবং ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতা দমনের জন্য সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন (যার বিরুদ্ধে মামলা নং-৩৮ এর চার্জশিট ২০২৫ সালের ২৯ এপ্রিল আদালতে জমা পড়ে), তাকে ঢাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ জেলায় পদায়ন করা হয়েছে।

‎বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেন এবং শরিফুজ্জামান আপন ভায়রা ভাই। আর এই আত্মীয়করণের পুরো ইন্ধনদাতা ও রক্ষক হিসেবে কাজ করছেন শফিকুল ইসলাম। ত্যাগী প্রকৌশলীদের কোণঠাসা করে তিনি ফ্যাসিবাদের দোসরদের গুরুত্বপূর্ণ পদ উপহার দিচ্ছেন।

‎এলজিইডির ভেতরে এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। সৎ ও বঞ্চিত কর্মকর্তারা মনে করছেন, এলজিইডির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হলে শফিকুল ইসলামের এই বদলি-বাণিজ্য ও ফ্যাসিস্ট দোসরদের পৃষ্ঠপোষকতার অবসান জরুরি। বিগত সময়ে দুদকের কিছু অনুসন্ধান এবং বিভিন্ন তদন্তের ফাইল চাপা পড়ে থাকায় এই সিন্ডিকেট আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। অধিদপ্তরের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ফিরিয়ে আনতে অবিলম্বে একটি স্বাধীন উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিশন গঠন করে মো. শফিকুল ইসলামসহ এই চক্রের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

‎সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীর চেয়েও নিজেকে ক্ষমতাধর ভাবা এই শফিকুল ইসলামের সিন্ডিকেটকে যদি এখনই থামানো না যায়, তবে বর্তমান সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

‎অভিযোগের বিষয়ে জানতে শফিকুল ইসলামের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগের বিস্তারিত লিখে তাকে এসএমএস পাঠানো হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।

নিজস্ব প্রতিবেদক

৫-৭-২০২৬ রাত ৮:৫৬

news image

‎আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দীর্ঘ সময় পার হলেও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) এখনও কাটেনি আওয়ামী লীগপন্থি ও বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের নেতাদের আধিপত্য। বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতায় গুরুত্ব দিয়েছেন। কিন্তু তারপরও আওয়ামী সিন্ডিকেটের কারণে পরিবর্তন ঘটেনি এলজিইডিতে। জানা গেছে, এর মূল হোতা নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলাম, যিনি ‘রংধনু শফিক’ নামে ইতোমধ্যে পরিচিত লাভ করেছেন অধিদপ্তরে। তার ইশারা ছাড়া কোনো ফাইল নড়ে না। তিনি টাকার বিনিময়ে বদলি ও পদায়ন বাণিজ্য চালান। তার অপকর্মের প্রতিবাদ করলে প্রতিবাদকারীকে দেওয়া হয় শাস্তিমূলক বদলি। শফিকুল ইসলামই এলজিইডিতে আওয়ামীপন্থিদের পুনর্বাসনের প্রধান কারিগর। 

‎সূত্রমতে, এলজিইডির নিয়োগ ও পদায়ন শাখাকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী চক্র সক্রিয় রয়েছে। এই চক্র এলজিইডিতে বিভিন্ন পদে বদলি ও পদায়নে প্রভাব বিস্তার করছে। সিন্ডিকেটের মূল হোতা হিসেবে কাজ করছেন এলজিইডির নিয়োগ ও পদায়ন শাখার দায়িত্বে থাকা নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. শফিকুল ইসলাম। সরকার পতনের পর এখনও আওয়ামী লীগের আধিপত্য ধরে রেখেছেন শফিকুল ইসলাম। সংস্থায় বদলি, পদায়নে তার একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে বলে জানা গেছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে তিনি এখন এলজিইডির ‘রংধনু শফিক’ নামে পরিচিত। আওয়ামী লীগ মতাদর্শী এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বর্তমানে বহাল থাকা আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী প্রকৌশলীদের আশ্রয় দেওয়া, ইন্ধন জোগানো এবং কোটি কোটি টাকার বদলি-বাণিজ্যের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে।

‎মো. শফিকুল ইসলাম ২০১১ সালে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করে আদালতের মামলার মাধ্যমে এলজিইডির রাজস্ব খাতে নিয়োগ পান। হবিগঞ্জ জেলায় দীর্ঘ ১১ বছর সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী থাকাকালীন তিনি সহকর্মীদের কাছে নিজ জেলা নওগাঁ থেকে আওয়ামী লীগের টিকিটে এমপি নির্বাচন করার ইচ্ছার কথা জানান- এই দাবি তার তৎকালীন সহকর্মীদের।

‎২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শফিকুল রাতারাতি খোলস পাল্টে ফেলেন। বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের তৎকালীন সভাপতি ও সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. আলী আখতার হোসেনকে ম্যানেজ করে তিনি এলজিইডি সদর দপ্তরের প্রশাসন শাখায় পোস্টিং নেন। এরপর একাধিক প্রধান প্রকৌশলী পরিবর্তন হলেও বহাল তবিয়তে রয়ে গেছেন শফিকুল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৭ জন প্রধান প্রকৌশলীর অধীনে একই পদে বহাল রয়েছেন তিনি। যেকোনো পরিস্থিতিতে রঙ বদলাতে পারদর্শী হওয়ায় অধিদপ্তরে তাকে এলজিইডির ‘রংধনু শফিক’ বলে ডাকা হয়।

‎মন্ত্রণালয় এবং সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নাম ভাঙিয়ে এলজিইডির প্রশাসনকে জিম্মি করে রেখেছেন শফিকুল ইসলাম। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলজিইডির এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এবং সচিব মো. শহিদুল হাসানকে ম্যানেজ করার দাবি করেই শফিকুল এই বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। বিভিন্ন জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী, উপজেলা প্রকৌশলী এবং সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলীদের লোভনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে বদলি করার নামে তিনি শুরু করেছেন প্রকাশ্য নিলাম প্রক্রিয়া।

‎সম্প্রতি এই সিন্ডিকেটের কিছু সুনির্দিষ্ট বদলি-বাণিজ্যের তথ্য পাওয়া গেছে। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে পদায়ন করে মোটা অঙ্কের অর্থ তোলার অভিযোগ উঠেছে। সাভার, কেরানীগঞ্জ, ধামরাই উপজেলা প্রকৌশলী এবং ঢাকা, টাঙ্গাইল ও কক্সবাজার জেলার সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী পদে বদলির ক্ষেত্রে জনপ্রতি ১০ লাখ টাকারও বেশি আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।

‎পদোন্নতি-বাণিজ্য : এলজিইডির ১৯৭ জন নির্বাহী প্রকৌশলীর পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় জনপ্রতি ৫ লাখ টাকা এবং সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলীদের পদোন্নতিতেও বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি।

‎প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগ : বড় বড় প্রকল্পের পিডি হিসেবে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের নেতাদের নাম প্রস্তাবের পেছনেও রয়েছে শফিকুলের মদদ। যেমন আরসিআইপি প্রকল্পের পিডি (চুয়েটের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা কামরুল ইসলাম) এবং নগর উন্নয়ন প্রকল্পের পিডি (ডুয়েটের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ) এখনও বহাল তবিয়তে আছেন তারই বদৌলতে। এমনকি সিআইবিআরআর-২ প্রকল্পের পিডি হিসেবে বুয়েটের সাবেক ছাত্রদল-সংশ্লিষ্ট এক প্রকৌশলীর ফাইল চূড়ান্ত হওয়ার পরও তাকে বাদ দিয়ে বিপুল অর্থের বিনিময়ে সাবেক মন্ত্রী তাজুল ইসলামের আশীর্বাদপুষ্ট ও পলাতক আওয়ামী ঠিকাদারের জামাতাকে পিডি বানানোর প্রস্তাব পাঠান শফিকুল।

‎নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলজিইডির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, শফিকুল ইসলামের ইশারা ছাড়া এলজিইডিতে এখন একটা ফাইলও নড়ে না। বদলি বা ভালো প্রজেক্টে পোস্টিং পেতে হলে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা তার সিন্ডিকেটের কাছে পৌঁছাতেই হবে। যারা প্রতিবাদ করছেন, তাদের ঢাকার বাইরে শাস্তিমূলক বদলি বা নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে।

‎সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে রাজনৈতিক পুনর্বাসন নিয়ে। শফিকুল ইসলাম কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ-মতাদর্শী কর্মকর্তাদের ঢাল হিসেবে কাজ করছেন। তারাই তার মূল শক্তি। এ কারণেই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও এলজিইডিতে বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের সুবিধাভোগী এবং আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন ‘বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের’ সক্রিয় সদস্যদের দাপট কমেনি।

‎অভিযোগ রয়েছে, এলজিইডির ঢাকা জেলার বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরিফুজ্জামান, যিনি বিগত আওয়ামী সরকারের সময় শেখ হেলালের আত্মীয় পরিচয়ে বাগেরহাটে ৫ বছর দাপটের সঙ্গে কাজ করেছেন এবং ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতা দমনের জন্য সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন (যার বিরুদ্ধে মামলা নং-৩৮ এর চার্জশিট ২০২৫ সালের ২৯ এপ্রিল আদালতে জমা পড়ে), তাকে ঢাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ জেলায় পদায়ন করা হয়েছে।

‎বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেন এবং শরিফুজ্জামান আপন ভায়রা ভাই। আর এই আত্মীয়করণের পুরো ইন্ধনদাতা ও রক্ষক হিসেবে কাজ করছেন শফিকুল ইসলাম। ত্যাগী প্রকৌশলীদের কোণঠাসা করে তিনি ফ্যাসিবাদের দোসরদের গুরুত্বপূর্ণ পদ উপহার দিচ্ছেন।

‎এলজিইডির ভেতরে এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। সৎ ও বঞ্চিত কর্মকর্তারা মনে করছেন, এলজিইডির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হলে শফিকুল ইসলামের এই বদলি-বাণিজ্য ও ফ্যাসিস্ট দোসরদের পৃষ্ঠপোষকতার অবসান জরুরি। বিগত সময়ে দুদকের কিছু অনুসন্ধান এবং বিভিন্ন তদন্তের ফাইল চাপা পড়ে থাকায় এই সিন্ডিকেট আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। অধিদপ্তরের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ফিরিয়ে আনতে অবিলম্বে একটি স্বাধীন উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিশন গঠন করে মো. শফিকুল ইসলামসহ এই চক্রের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

‎সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীর চেয়েও নিজেকে ক্ষমতাধর ভাবা এই শফিকুল ইসলামের সিন্ডিকেটকে যদি এখনই থামানো না যায়, তবে বর্তমান সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

‎অভিযোগের বিষয়ে জানতে শফিকুল ইসলামের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগের বিস্তারিত লিখে তাকে এসএমএস পাঠানো হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।